বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৪ পূর্বাহ্ন

টেকনাফের ৩০ টাকার ইয়াবা চট্টগ্রামে ২০০ টাকা

টেকনাফের ৩০ টাকার ইয়াবা চট্টগ্রামে ২০০ টাকা

টেকনাফের ৩০ টাকার ইয়াবা চট্টগ্রামে ২০০ টাকা

আবুল হাসনাত মিনহাজ, চট্টগ্রাম : সীমান্তে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ভেদ করে কৌশলে ঢুকে পড়ছে মাদক। মিয়ানমার থেকে নাফ নদী হয়ে বান্দরবানের পাহাড়ি সীমান্ত দিয়ে পানির স্রোতের মতো মরণনেশা ইয়াবা দেশে আসছে। সড়ক ও নৌপথের ২৯টি পয়েন্ট দিয়ে এ মাদক সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গাদের কয়েকটি গ্রুপ এবং দেশের মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা ইয়াবা আনছে। ধরন অনুযায়ী টেকনাফে ৩৮ থেকে ৫০ টাকায় প্রতি পিস ইয়াবা বিক্রি হলেও চট্টগ্রামে তা ১২০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক সময় চট্টগ্রামে প্রতি পিস ইয়াবা বিক্রি হতো ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। বর্তমানে ১০০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে তা পাওয়া যাচ্ছে। সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় মাদকের দাম অর্ধেকে নেমেছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ইয়াবা সেবনে আসক্তির হারও। ধরন অনুযায়ী টেকনাফে প্রতি পিস ইয়াবা ৩৮ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হলেও চট্টগ্রামে তা ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল এলাকায় মিয়ানমারের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং দেশটির নিয়ন্ত্রণাধীন একটি গ্রুপের অধীনে কারখানাগুলোয় ইয়াবা তৈরি হচ্ছে। এসব গ্রুপ দেশটির বর্ডার গার্ড ফোর্সের সহায়তায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ব্যবহার করে ইয়াবা পাচার করছে।

সড়ক ও নৌপথের ২৯টি পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা আসছে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং, হ্নীলা, হোয়াক্যাং, উখিয়া বালুখালি, পালংখালী, রাজাপালং ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুনধুমসহ বিস্তীর্ণ সীমান্ত পাচারের নিরাপদ রুট হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সড়ক পথের পাশাপাশি নৌপথেও ইয়াবার বড় বড় চালান পাচার হচ্ছে। মাছ ধরার ট্রলারে সাগর পাড়ি দিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা দেশে মাদক আনছে। টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, মহেশখালী, কর্ণফুলী চ্যানেলে আনোয়ারা, গহিরা, বাঁশখালী, জলদি এবং চট্টগ্রামের পারকির চর, পতেঙ্গা, সন্দ্বীপ এবং সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা মাদকের পাচারের নৌরুট হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। এসব রুট দিয়ে আসা ইয়াবা চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক ও রেলপথের বিভিন্ন পরিবহণে করে কৌশলে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পাচার হয়। বঙ্গোপসাগরের মোহনা (মেঘনা নদী) পাড়ি দিয়ে বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, পিরোজপুর, নোয়াখালীর হাতিয়া, লক্ষ্মীপুর মজু চৌধুরীর ঘাট, চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ, ষাটনল এবং নারায়ণগঞ্জ হয়ে রাজধানী ঢাকায় ইয়াবা পাচার হচ্ছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক জাফরুল্ল্যাহ কাজল দৈনিক প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৪ কোটি। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিশু মাদকাসক্ত এবং তাদের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ শিশু মাদক গ্রহণের খরচ মেটাতে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। মাদকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সবখানেই পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা। গোপনে বিক্রি হলেও কিশোর-তরুণ এবং বয়স্ক মানুষ সবাই জানে কার কাছে, কীভাবে ইয়াবাসহ অন্য মাদক পাওয়া যাবে। মাদকের প্রবেশপথ হিসেবে বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন ৩২টি জেলাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে।

তিনি আরোও বলেন, আসলে ইয়াবার জন্য মিয়ানমারের পছন্দের বাজার ছিল থাইল্যান্ড। কিন্তু আমাদের দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা কল্পনার বাইরে চলে যাওয়ায় ইয়াবার বড় বাজারে পরিণত হয় বাংলাদেশ। এই তথ্য বাংলাদেশের মানুষের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক ও ভীতিকর।

বলা হয়, দেশে যে পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয়, তা মোট চোরাকারবারের ১০ ভাগেরও কম।মাদক চোরাকারবারের রাঘববোয়ালরা কেউ ধরা পড়ে না। অনেকে বিদেশে বসেই নিয়ন্ত্রণ করছেন মাদক চোরাকারবার। দেশ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশে পুরুষের পাশাপাশি নারী মাদক গ্রহণকারীর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সামাজিক স্টিগমার কারণে নারী মাদকসেবীরা চিকিৎসা গ্রহণে অনাগ্রহী। নারীদের মধ্যে মাদক গ্রহণের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই মায়েদের সন্তান হবে সবচেয়ে বিপদাপন্ন।

সমাজসেবীরা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এতে কোনো ধরনের তথ্য পাচ্ছে না। লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বিটকয়েন। এ কারণে মাদক চক্রকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। মাদক চোরাকারবারিরা যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করছেন, সে অনুযায়ী আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নেই। সক্ষমতা অর্জনে উদ্যোগ না নিলে দেশে আরও বেশি মাদকের ঝুঁকি তৈরি হবে।’ আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন দৈনিক প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। খালি খালি আইন করে মাদক নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। তবে দেশের মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |